সময়ের যাকাত | মায়ের জন্য সময় না থাকলে সব সম্পদ বৃথা।

 

প্রথম পর্ব: ব্যস্ততার অজুহাত 

ইমতিয়াজ সাহেব ছিলেন একজন অত্যন্ত সফল এবং ব্যস্ত কর্পোরেট এক্সিকিউটিভ। তার দিন শুরু হতো ভোরের ফ্লাইটে আর শেষ হতো গভীর রাতের বোর্ড মিটিংয়ে। তার সময় ছিল অর্থের চেয়েও দামী, আর তার জীবনের প্রতিটি মিনিট ছিল হিসাব করা। তিনি একজন ভালো মুসলমান হিসেবেও নিজেকে পরিচয় দিতেন। তিনি তার বিপুল আয়ের যাকাত প্রতি বছর রমজান মাসে ঘটা করে আদায় করতেন। বড় বড় এতিমখানা এবং ফাউন্ডেশনে চেক পাঠিয়ে দিয়েই তিনি মনে করতেন, তার ধর্মীয় এবং সামাজিক দায়িত্ব শেষ।

তার বৃদ্ধা মা, আমিনা বেগম, থাকতেন শহরের অন্য প্রান্তে, একটি পুরনো বাড়িতে। ইমতিয়াজ সাহেব তার মায়ের জন্য সব ধরনের আধুনিক সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। বাড়িতে সার্বক্ষণিক কাজের লোক, নার্স, ড্রাইভার—সবই ছিল। ছিল না শুধু তার নিজের উপস্থিতি।

তিনি সপ্তাহে একবার, ছুটির দিনে, কয়েক মিনিটের জন্য মায়ের সাথে দেখা করতে যেতেন। সেই সময়টুকুতেও তার হাতে থাকত মোবাইল ফোন, ল্যাপটপে চলত অফিসের কাজ। মা যখন তার সাথে কথা বলতে চাইতেন, তার ছোটবেলার গল্প করতে চাইতেন, তখন ইমতিয়াজ সাহেব বলতেন, "মা, প্লিজ। এখন না। অনেক কাজ বাকি আছে। তোমার কী লাগবে বলো, আমি ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।"

তিনি বুঝতে পারতেন না, তার মায়ের টাকা বা সুবিধার প্রয়োজন ছিল না, তার প্রয়োজন ছিল ছেলের একটু সঙ্গ, একটু সময়। তিনি তার মায়ের একাকীত্বকে দামি উপহার আর কাজের লোক দিয়ে পূরণ করার চেষ্টা করতেন। তিনি ভাবতেন, তিনি তো মায়ের সব প্রয়োজনই মেটাচ্ছেন, এর চেয়ে বেশি আর কী করার আছে? তিনি ভুলে গিয়েছিলেন, কিছু সম্পর্ক শুধু অর্থ দিয়ে পরিমাপ করা যায় না, তার জন্য 'সময়' নামক অমূল্য সম্পদটিও ব্যয় করতে হয়।

দ্বিতীয় পর্ব: এক অনিবার্য ডাক

একদিন গভীর রাতে, যখন ইমতিয়াজ সাহেব একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেজেন্টেশন তৈরি করছিলেন, তখন হাসপাতাল থেকে একটি ফোন এল। তার মা গুরুতর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছেন এবং তাকে আইসিইউ-তে ভর্তি করা হয়েছে।

ইমতিয়াজ সাহেব সবকিছু ফেলে ছুটে হাসপাতালে গেলেন। তিনি দেখলেন, তার মা অচেতন অবস্থায় বিছানায় শুয়ে আছেন, তার চারপাশে বিভিন্ন জীবনদায়ী যন্ত্র লাগানো। ডাক্তাররা জানালেন, পরিস্থিতি খুবই সঙ্কটজনক।

সেই প্রথম, ইমতিয়াজ সাহেবের মনে হলো, তার পায়ের তলার মাটি সরে যাচ্ছে। তার এত সম্পদ, এত ক্ষমতা, এত যোগাযোগ—কোনো কিছুই তার মায়ের নিঃশ্বাসকে ফিরিয়ে আনতে পারবে না। তিনি আইসিইউ-এর কাঁচের দেয়ালের বাইরে দাঁড়িয়ে তার মায়ের ফ্যাকাসে মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তার মনে পড়তে লাগল, কতবার তার মা তাকে শুধু একটু বসার জন্য, একটু কথা বলার জন্য অনুরোধ করেছেন, আর তিনি কতবার ব্যস্ততার অজুহাত দেখিয়ে চলে এসেছেন।

তার মনে হলো, তিনি তার মায়ের জন্য যা কিছু করেছেন, তা সবই ছিল এক ধরনের বিনিয়োগ, যার বিনিময়ে তিনি সামাজিক সম্মান বা মানসিক আত্মতৃপ্তি চেয়েছেন। কিন্তু তিনি কখনো নিঃস্বার্থভাবে তার 'সময়'টুকু তার মাকে দেননি।

তিনি হাসপাতালের করিডোরে বসে রইলেন, এক অসহায়, পরাজিত মানুষের মতো। তার মনে হলো, তিনি তার জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যবসায় লোকসান করে ফেলেছেন—যে ব্যবসার লাভ-ক্ষতির হিসাব দুনিয়ার কোনো ব্যালেন্স শিটে লেখা থাকে না।

তৃতীয় পর্ব: এক ফোঁটা অশ্রুর মূল্য

কয়েকদিন পর, আমিনা বেগমের জ্ঞান ফিরল। তিনি চোখ মেলে প্রথমে তার ছেলেকেই খুঁজলেন। ইমতিয়াজ সাহেব যখন তার হাত ধরলেন, তখন তিনি খুব দুর্বল গলায় বললেন, "বাবা, তুই এসেছিস? আমার পাশে একটু বস। আমার ভয় করছে।"

ইমতিয়াজ সাহেব আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। তিনি মায়ের হাত ধরে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। তিনি বললেন, "মা, আমাকে ক্ষমা করে দাও। আমি তোমার জন্য কিছুই করতে পারিনি।"

আমিনা বেগম তার ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, "কে বলেছে তুই কিছু করিসনি? তুই তো আমার সবচেয়ে বড় সম্পদ। শুধু... শুধু আমার একটু একা লাগত, বাবা।"

সেই দিন থেকে, ইমতিয়াজ সাহেব তার সব কাজ একপাশে সরিয়ে রাখলেন। তিনি দিনের পর দিন, রাতের পর রাত হাসপাতালের বেডের পাশে বসে থাকতেন। তিনি তার মাকে কোরআন তেলাওয়াত করে শোনাতেন, তার হাত ধরে থাকতেন এবং তার ছোটবেলার গল্প শুনতেন। তিনি প্রথমবার অনুভব করলেন, তার মায়ের সঙ্গ কতটা প্রশান্তির।

একদিন, তার মা তাকে বললেন, "বাবা, আমার জন্য তোর এত ক্ষতি হচ্ছে। তুই তোর কাজে যা।"

ইমতিয়াজ সাহেব তার মায়ের চোখে চোখ রেখে বললেন, "মা, এই পৃথিবীর সব কাজের চেয়ে, সব সম্পদের চেয়ে তোমার এই সঙ্গটাই আমার কাছে সবচেয়ে দামী। আমি আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিটিংটা এখন করছি, তোমার সাথে।"

তার এই কথায় আমিনা বেগমের চোখ দিয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। সেই এক ফোঁটা জলে ছিল তার ছেলের প্রতি এতদিনের জমে থাকা সব অভিমানের অবসান এবং এক অনাবিল তৃপ্তি।

চতুর্থ পর্ব: সময়ের যাকাত

আমিনা বেগম সেই যাত্রায় আল্লাহর রহমতে সুস্থ হয়ে উঠলেন। কিন্তু এই ঘটনা ইমতিয়াজ সাহেবের জীবনকে পুরোপুরি বদলে দিল। তিনি বুঝতে পারলেন, সম্পদের যেমন যাকাত দিতে হয়, তেমনি আল্লাহ প্রদত্ত প্রতিটি নেয়ামতেরও যাকাত দিতে হয়। সময়ের যাকাত হলো, সেই সময় থেকে কিছু অংশ আল্লাহর রাস্তায়, বিশেষ করে বাবা-মায়ের সেবায় ব্যয় করা। জ্ঞানের যাকাত হলো, তা অন্যকে শেখানো। আর ক্ষমতার যাকাত হলো, তা দিয়ে দুর্বলের সাহায্য করা।

তিনি তার জীবনযাত্রায় এক বিরাট পরিবর্তন আনলেন। তিনি তার কাজের সময় কমিয়ে আনলেন। তিনি এখন আর অপ্রয়োজনীয় মিটিং বা বিদেশ সফরে যেতেন না। তিনি তার দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় তার মায়ের জন্য বরাদ্দ রাখলেন। তিনি নিজে তার মাকে নিয়ে হাঁটতে বেরোতেন, তার পছন্দের খাবার রান্না করে খাওয়াতেন এবং তার সাথে মন খুলে গল্প করতেন।

তিনি লক্ষ্য করলেন, যখন থেকে তিনি তার মাকে 'সময়' দিতে শুরু করেছেন, তার অন্য সব কাজে আল্লাহ অভাবনীয় বরকত দিচ্ছেন। তার অল্প সময়ের কাজও অনেক বেশি ফলপ্রসূ হচ্ছে। তার মনের সব অস্থিরতা দূর হয়ে গেছে। তিনি এখন তার মায়ের হাসিমুখের মধ্যেই তার জীবনের আসল সাফল্য খুঁজে পান।

পঞ্চম পর্ব: সত্যিকারের ধনী

ইমতিয়াজ সাহেব এখন আর শুধু সম্পদের যাকাত দেন না, তিনি এখন তার 'সময়ের যাকাত'ও নিয়মিত আদায় করেন। তিনি শুধু তার মায়েরই নন, এলাকার অন্যান্য নিঃসঙ্গ বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদেরও খোঁজখবর নেন। তিনি একটি ফাউন্ডেশন তৈরি করেছেন, যা একাকী বৃদ্ধদের মানসিক সহায়তার জন্য কাজ করে।

তিনি এখন প্রায়ই তার কর্পোরেট জগতের বন্ধুদের বলেন, "আমরা আমাদের বাবা-মায়ের জন্য যা কিছু করি, তা কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়। এটা আমাদের উপর তাদের হক বা অধিকার। আর এই হক আদায় করার মধ্যেই লুকিয়ে আছে দুনিয়া ও আখেরাতের সফলতা। আমরা হয়তো আমাদের বাবা-মায়ের দেওয়া জীবনের ঋণ কোনোদিন শোধ করতে পারব না, কিন্তু তাদের দেওয়া সময়ের বিনিময়ে যদি আমাদের সময়টুকুও দিতে না পারি, তাহলে আমাদের মতো দুর্ভাগা আর কেউ নেই।"

ইমতিয়াজ সাহেবের গল্পটা শিখিয়ে দিল যে, বাবা-মায়ের সেবা শুধু টাকা-পয়সা বা সুযোগ-সুবিধা দিয়ে হয় না। তাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হলো আমাদের সঙ্গ, আমাদের মনোযোগ এবং আমাদের ভালোবাসা। সম্পদের যাকাত আমাদের মালকে পবিত্র করে, আর সময়ের যাকাত আমাদের জীবনকে অর্থবহ এবং বরকতময় করে তোলে। সত্যিকারের ধনী সে নয়, যার অনেক টাকা আছে। সত্যিকারের ধনী সে, যার বাবা-মায়ের দোয়ার ছায়া তার মাথার উপর আছে।

এই গল্পটি যদি আপনার হৃদয়ে পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ববোধকে নতুন করে জাগিয়ে তোলে, তবে এমন আরও আত্মশুদ্ধিমূলক ও জীবনমুখী গল্প শুনতে আমাদের চ্যানেল 'বাংলা অডিও গল্প'-কে সাবস্ক্রাইব করে আমাদের এই শিক্ষণীয় যাত্রায় অংশ নিন। আপনার একটি সাবস্ক্রিপশন আমাদের নতুন গল্প তৈরিতে অমূল্য প্রেরণা জোগায়।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন

Ads 2