প্রথম পর্ব: অভিযোগের জীবন
হাসান সাহেব ছিলেন একজন সৎ এবং পরিশ্রমী মানুষ। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে তিনি সামান্য কেরানির চাকরি করতেন। তার আয় ছিল সীমিত, যা দিয়ে মাস চালাতে তাকে বেশ হিমশিম খেতে হতো। তার জীবনের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ ছিল, তার কোনো ছেলে সন্তান নেই, পরপর তিনটি মেয়ে। এই নিয়ে তার স্ত্রী জামিলারও আফসোসের শেষ ছিল না।
হাসান সাহেব নামাজ-রোজা করতেন, কিন্তু তার মনের গভীরে আল্লাহর ফয়সালার প্রতি ছিল এক ধরনের চাপা অসন্তোষ। তিনি প্রায়ই হতাশ হয়ে বলতেন, "আমি জীবনে কারো ক্ষতি করিনি, হারাম খাইনি, তবুও আল্লাহ আমাকে এত কষ্টে কেন রেখেছেন? আমার ভাগ্যে কি একটু সুখ লেখা ছিল না?" তার বন্ধুদের উন্নতি দেখলে তার মনে হতো, আল্লাহ যেন তাকেই শুধু বঞ্চিত করেছেন। ছেলে সন্তান না হওয়ায় তিনি ভাবতেন, তার বংশের বাতি দেওয়ার মতো কেউ রইল না।
তার তিন মেয়ে—সুমাইয়া, ফাতিমা এবং আয়েশা। তিনজনই ছিল রূপে-গুণে অনন্য এবং পড়াশোনায় অত্যন্ত মেধাবী। কিন্তু হাসান সাহেব তাদের এই গুণগুলো তেমনভাবে দেখতে পেতেন না। তার কাছে তারা ছিল 'বোঝা'। তাদের বিয়ে দেওয়ার জন্য টাকা জমানোর চিন্তা তাকে সারাক্ষণ তাড়া করে বেড়াত।
একদিন তার বড় মেয়ে সুমাইয়া স্কুল থেকে একটি বৃত্তি পরীক্ষার ফর্ম নিয়ে এল। সে全国 পর্যায়ে একটি প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে চায়। হাসান সাহেব ফর্মটি দেখেই বিরক্ত হয়ে বললেন, "এসব করে কী হবে? শেষ পর্যন্ত তো পরের বাড়িই চলে যাবি। এত টাকা খরচ করে লাভ কী? তার চেয়ে বরং ঘরের কাজ শেখ।"
বাবার কথায় সুমাইয়ার কচি মনটা দুঃখে ভরে গেল, কিন্তু সে কিছুই বলল না। জামিলা বেগম আড়াল থেকে সব শুনে তার স্বামীকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন, "মেয়েরা আল্লাহর রহমত। আপনি এমন করে বলবেন না। ওদের মনে কষ্ট দেবেন না। আল্লাহ যা করেন, ভালোর জন্যই করেন।"
হাসান সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে উত্তর দিলেন, "কীসের ভালো, জামিলা? তুমি আর আমি মরে গেলে এদের কে দেখবে? তাকদীরে যদি ভালোই থাকত, তাহলে আল্লাহ একটা ছেলে অন্তত দিতেন।"
তার এই অভিযোগ আর হতাশা তার ইবাদতকেও প্রভাবিত করত। তিনি নামাজ পড়তেন ঠিকই, কিন্তু তাতে কোনো প্রাণ ছিল না, ছিল শুধু নিয়ম রক্ষা। তিনি জানতেন না যে, আল্লাহর পরিকল্পনা তার কল্পনার চেয়েও অনেক উত্তম এবং তিনি যা নিয়ে আফসোস করছেন, সেই মেয়েরাই একদিন তার জন্য আল্লাহর শ্রেষ্ঠ নেয়ামত হিসেবে প্রমাণিত হবে।
দ্বিতীয় পর্ব: তাকদীরের প্রথম ঝলক
সময় গড়িয়ে চলল। হাসান সাহেবের অভিযোগ আর হতাশার মধ্যেই তার মেয়েরা বড় হতে লাগল। সুমাইয়া তার বাবার বারণ সত্ত্বেও মায়ের উৎসাহে সেই বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল এবং সবাইকে অবাক করে দিয়ে সে জাতীয় পর্যায়ে প্রথম স্থান অধিকার করল। তার পড়াশোনার সমস্ত দায়িত্ব সরকার নিয়ে নিল। খবরটা শুনে হাসান সাহেব কিছুটা খুশি হলেন, কিন্তু তার মনের গভীরের আক্ষেপটা গেল না।
কয়েক বছর পর, হাসান সাহেব হঠাৎ করেই এক মারাত্মক হৃদরোগে আক্রান্ত হলেন। তাকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করতে হলো। ডাক্তাররা জানালেন, তার জরুরি ভিত্তিতে বাইপাস সার্জারি প্রয়োজন, যার জন্য প্রায় তিন লক্ষ টাকার দরকার।
এই খবর শুনে হাসান সাহেবের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। তার সারাজীবনের সঞ্চয় দিয়েও এত টাকা জোগাড় করা অসম্ভব। তিনি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে কাঁদতে লাগলেন, "হে আল্লাহ, আমি তো আগেই বলেছিলাম, আমার ভাগ্যটাই খারাপ। এখন আমি বিনা চিকিৎসায় মারা যাব।"
ঠিক সেই মুহূর্তে তার মেয়ে সুমাইয়া, যে এখন দেশের সেরা মেডিকেল কলেজের শেষ বর্ষের ছাত্রী, তার বাবার হাত ধরে বলল, "বাবা, আপনি কোনো চিন্তা করবেন না। আল্লাহ আছেন।"
সুমাইয়া তার বৃত্তির জমানো টাকা এবং কলেজের শিক্ষকদের সাহায্য নিয়ে অল্প কিছু টাকা জোগাড় করল। কিন্তু বাকি টাকাটা কীভাবে আসবে, তা নিয়ে সবাই যখন চিন্তিত, তখন ঘটল এক অলৌকিক ঘটনা। সুমাইয়ার কলেজের অধ্যক্ষ, যিনি তার মেধা এবং বিনয়ী আচরণে মুগ্ধ ছিলেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে দেশের এক ধনী শিল্পপতির কাছে সুমাইয়ার বাবার চিকিৎসার জন্য সাহায্যের আবেদন জানালেন। সেই শিল্পপতি সুমাইয়ার মেধার কথা শুনে তার চিকিৎসার সমস্ত ব্যয়ভার গ্রহণ করতে রাজি হলেন।
অপারেশন সফল হলো। হাসান সাহেব ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলেন। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে তিনি প্রথমবার গভীরভাবে উপলব্ধি করলেন, যে মেয়েকে তিনি একদিন 'বোঝা' ভেবেছিলেন, আজ তারই কারণে তিনি নতুন জীবন ফিরে পেয়েছেন। তার মনে প্রথমবার আল্লাহর ফয়সালার প্রতি এক ধরনের আস্থা জন্মাল। তিনি বুঝতে শুরু করলেন, তিনি যা দেখতে পাচ্ছেন, তার বাইরেও আল্লাহর এক বিশাল পরিকল্পনা রয়েছে।
তৃতীয় পর্ব: রহমতের বর্ষণ
হাসান সাহেবের সুস্থতার পর তাদের পরিবারে যেন আল্লাহর রহমত বর্ষিত হতে লাগল। তার মেজো মেয়ে ফাতিমা, যে ছোটবেলা থেকেই ডিজাইনিং এবং সেলাইয়ের কাজে খুব দক্ষ ছিল, সে মায়ের সহায়তায় ঘরে বসেই কাপড়ের উপর সুন্দর নকশার কাজ শুরু করল। তার ডিজাইন করা পোশাকগুলো অল্পদিনেই পরিচিত মহলে জনপ্রিয়তা পেল। একটি অনলাইন পেজের মাধ্যমে তার ব্যবসা ধীরে ধীরে বাড়তে লাগল। অল্প দিনের মধ্যেই সে তার বাবাকেও আর্থিকভাবে সাহায্য করার মতো অবস্থায় চলে গেল।
ছোট মেয়ে আয়েশা ছিল অসম্ভব মেধাবী। সে কোরআনের হাফেজা ছিল এবং তার কণ্ঠ ছিল অসাধারণ। এলাকার মসজিদে সে মেয়েদের কোরআন শিক্ষা দিত। তার পড়ানোর পদ্ধতি এবং সুন্দর তেলাওয়াত সবার মন জয় করে নিল। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ তাদের মেয়েদের তার কাছে কোরআন শিখতে পাঠাতে লাগল। আয়েশার রোজগার হয়তো খুব বেশি ছিল না, কিন্তু তার কারণে তাদের বাড়িতে যে একটা রুহানি বা আধ্যাত্মিক পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, তার কোনো তুলনা হয় না।
হাসান সাহেব এখন তার মেয়েদের দিকে তাকালে আর আফসোস করেন না, বরং তার বুকটা গর্বে ভরে ওঠে। তিনি দেখছেন, তার তিন মেয়ে—একজন ডাক্তার হয়ে মানুষের জীবন বাঁচাচ্ছে, একজন উদ্যোক্তা হয়ে সংসারের হাল ধরেছে, আর একজন কোরআনের আলো ছড়িয়ে পরিবারে বরকত নিয়ে আসছে।
একদিন রাতে তাহাজ্জুদের নামাজে দাঁড়িয়ে তিনি সিজদায় লুটিয়ে পড়লেন। তিনি সেদিন কোনো অভিযোগ করলেন না, কোনো আক্ষেপ করলেন না। তিনি শুধু কাঁদলেন, কিন্তু সে কান্না ছিল কৃতজ্ঞতার। তিনি বললেন, "হে আল্লাহ, আমি কতই না অকৃতজ্ঞ আর অজ্ঞ ছিলাম! আমি তোমার কাছে ছেলে চেয়েছিলাম, কিন্তু তুমি আমাকে তার চেয়েও উত্তম—তিনটি জান্নাতের ফুল দান করেছ। আমি তোমার তাকদীরের উপর সন্তুষ্ট হতে পারিনি, আমাকে ক্ষমা করে দাও, হে আমার রব।"
সেই দিন থেকে হাসান সাহেবের জীবন বদলে গেল। তার মন থেকে সব হতাশা দূর হয়ে গেল। তিনি অল্প আয়েও সুখী থাকতে শিখলেন, কারণ তিনি বুঝেছিলেন, প্রকৃত সুখ সম্পদে নয়, বরং আল্লাহর ফয়সালার উপর সন্তুষ্ট থাকার মধ্যেই নিহিত।
চতুর্থ পর্ব: উত্তম প্রতিদান
সুমাইয়া ডাক্তার হয়ে গ্রামে ফিরে একটি চ্যারিটেবল ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করার সিদ্ধান্ত নিল, যাতে গরীব মানুষ বিনামূল্যে চিকিৎসা পায়। ফাতিমার বুটিক এখন শহরের একটি পরিচিত ব্র্যান্ড, যেখানে অনেক দুঃস্থ মহিলার কর্মসংস্থান হয়েছে। আর আয়েশার মক্তবটি একটি পূর্ণাঙ্গ মহিলা মাদ্রাসায় পরিণত হয়েছে। তিন বোন মিলে তাদের বাবাকে একটি সুন্দর, নতুন বাড়ি তৈরি করে দিল।
একদিন হাসান সাহেব এবং জামিলা বেগম তাদের নতুন বাড়ির বারান্দায় বসেছিলেন। তাদের তিন মেয়ে তাদের পাশে বসে সেবা করছিল। হাসান সাহেব তার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে ছলছল চোখে বললেন, "জামিলা, মনে আছে, আমি বলতাম আমাদের বংশে বাতি দেওয়ার কেউ নেই? দেখো, আমার তিন মেয়ে শুধু আমাদের ঘর নয়, গোটা এলাকাকে আলোকিত করে রেখেছে।"
জামিলা বেগম হেসে উত্তর দিলেন, "আমি তো আগেই বলেছিলাম, আল্লাহ যা করেন, ভালোর জন্যই করেন।"
ঠিক সেই সময় তাদের বাড়িতে একজন সম্মানিত আলেম এলেন। তিনি হাসান সাহেবের মেয়েদের সাফল্যের কথা শুনে তাদের সাথে দেখা করতে এসেছিলেন। তিনি হাসান সাহেবকে বললেন, "হাসান ভাই, আপনি দুনিয়ার সবচেয়ে ভাগ্যবান বাবাদের একজন। রাসূল (সাঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি তিনটি কন্যা সন্তানকে সুন্দরভাবে লালন-পালন করে এবং সুপাত্রস্থ করে, জান্নাত তার জন্য ওয়াজিব হয়ে যায়। আপনার মেয়েরা তো শুধু সুপাত্রস্থই হয়নি, তারা সমাজের সম্পদে পরিণত হয়েছে।"
আলেমের কথা শুনে হাসান সাহেবের মনটা এক গভীর প্রশান্তিতে ভরে গেল। তিনি বুঝতে পারলেন, আল্লাহ তাকে শুধু দুনিয়াতেই সম্মানিত করেননি, আখেরাতেও তার জন্য উত্তম প্রতিদানের ব্যবস্থা করে রেখেছেন।
পঞ্চম পর্ব: শুকরিয়ার জীবন
হাসান সাহেব তার বাকি জীবনটা আল্লাহর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা এবং সন্তুষ্টির সাথে কাটিয়ে দিলেন। তিনি আর কখনো নিজের ভাগ্য নিয়ে অভিযোগ করেননি। বরং, যখনই কোনো বিপদ বা কষ্ট আসত, তিনি বলতেন, "আলহামদুলিল্লাহ আলা কুল্লি হাল" (সর্বাবস্থায় আল্লাহর জন্য প্রশংসা)। তিনি তাকদীরের প্রতি ঈমানের প্রকৃত অর্থ খুঁজে পেয়েছিলেন।
তিনি প্রায়ই এলাকার তরুণদের বলতেন, "কখনো আল্লাহর ফয়সালা নিয়ে প্রশ্ন করো না। তিনি যা দেন বা যা দেন না, তার সবকিছুতেই মঙ্গল নিহিত থাকে, যা আমরা আমাদের সীমিত জ্ঞান দিয়ে বুঝতে পারি না। ধৈর্য ধরো এবং তার উপর ভরসা রাখো, তিনি তোমাকে এমনভাবে পুরস্কৃত করবেন, যা তুমি কল্পনাও করতে পারবে না।"
হাসান সাহেবের গল্পটা সবার জন্য এক বিরাট শিক্ষা হয়ে রইল। এটা শিখিয়ে দিল যে, আল্লাহর পরিকল্পনা আমাদের পরিকল্পনার চেয়ে উত্তম। যা নিয়ে আমরা হতাশ হই, হয়তো তার মধ্যেই আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় কল্যাণ লুকিয়ে থাকে। প্রকৃত মুমিন সে-ই, যে সুখ এবং দুঃখ উভয় অবস্থাতেই তাকদীরের প্রতি সন্তুষ্ট থাকে এবং বিশ্বাস করে যে, তার রবের কোনো ফয়সালাই তার জন্য অমঙ্গলজনক হতে পারে না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন