কুন ফায়াকুন | এক ডাক্তার যখন আল্লাহর কুদরতের সামনে মাথা নত করল | Islamic Emotional Story

 

প্রথম পর্ব: আস্থার সংকট

ডক্টর সায়মা চৌধুরী ছিলেন একজন স্বনামধন্য স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ। চিকিৎসা বিজ্ঞানের উপর তার ছিল অগাধ পাণ্ডিত্য এবং নিজের জ্ঞানের উপর ছিল প্রবল আস্থা। তিনি বিশ্বাস করতেন, বিজ্ঞান এবং আধুনিক প্রযুক্তি দিয়েই জীবনের প্রায় সব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। তিনি নিজে ধার্মিক ছিলেন, নামাজ পড়তেন, কিন্তু তার বিশ্বাসটা ছিল অনেকটাই যুক্তিনির্ভর। আল্লাহর উপর ভরসা বা 'তাওয়াক্কুল' বিষয়টিকে তিনি ততটা গুরুত্ব দিতেন না, যতটা দিতেন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এবং নিজের দক্ষতার উপর।

তার ক্লিনিকে প্রতিদিন অনেক নিঃসন্তান দম্পতি আসত। তিনি তাদের সর্বশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করে চিকিৎসা করতেন। যখন কোনো দম্পতি সন্তান লাভ করত, তখন তিনি মনে মনে আত্মতৃপ্তি পেতেন এবং ভাবতেন, এটা তার নিজের দক্ষতারই ফল। আর যখন কোনো চিকিৎসা ব্যর্থ হতো, তখন তিনি সেটাকে নিছক 'মেডিকেল ফেলিওর' বলে ধরে নিতেন।

তার নিজের জীবনেও একটি বড় অপূর্ণতা ছিল। বিয়ের দশ বছর পেরিয়ে গেলেও তিনি এবং তার স্বামী, রায়হান সাহেব, নিঃসন্তান ছিলেন। তিনি নিজের এবং স্বামীর সব ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়েছিলেন। রিপোর্ট অনুযায়ী, তাদের দুজনেরই কোনো শারীরিক সমস্যা ছিল না। বৈজ্ঞানিকভাবে, তাদের সন্তান ধারণে কোনো বাধাই ছিল না। কিন্তু তবুও, আল্লাহ তাদের সন্তান দেননি।

এই ব্যাপারটা সায়মাকে ভেতর থেকে হতাশ করে তুলেছিল। যে ডাক্তার শত শত নারীকে মা হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করতে সাহায্য করছে, সে নিজেই সেই স্বপ্ন থেকে বঞ্চিত। এই विरोधाभास (বৈপরীত্য) তার মনে এক গভীর অস্থিরতা তৈরি করেছিল। তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন, কিন্তু তার দোয়ায় ছিল এক ধরনের শর্ত—যেন তিনি আল্লাহকে তার ক্ষমতা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। তিনি ভাবতেন, "আমি তো সব চেষ্টাই করেছি, হে আল্লাহ। এখন তোমার দেওয়ার পালা।" তিনি বুঝতে পারতেন না যে, আল্লাহর দরবারে দোয়া করতে হয় একজন ভিখারির মতো, পাওনাদারের মতো নয়।

দ্বিতীয় পর্ব: এক বৃদ্ধার সরল বিশ্বাস

একদিন সায়মার ক্লিনিকে এলেন এক অতি সাধারণ চেহারার বৃদ্ধা, সাথে তার পুত্রবধূ। পুত্রবধূটির নাম আসমা। বিয়ের পাঁচ বছর হয়ে গেলেও তার কোনো সন্তান হচ্ছিল না। গ্রামের অনেক কবিরাজ-হেকিম দেখিয়ে অবশেষে তারা শহরের সেরা ডাক্তার, সায়মার কাছে এসেছেন।

সায়মা তাদের সব রিপোর্ট দেখলেন। রিপোর্ট অনুযায়ী, আসমার গর্ভধারণের সম্ভাবনা খুবই কম, প্রায় অসম্ভব। তিনি খুব সরাসরি এবং কিছুটা যান্ত্রিক গলায় বৃদ্ধাকে বললেন, "দেখুন, আপনার বৌমার যা সমস্যা, তাতে আধুনিক চিকিৎসা ছাড়া কোনো উপায় নেই। এবং সেই চিকিৎসাতেও সফলতার নিশ্চয়তা খুব কম। খরচও অনেক।"

কিন্তু বৃদ্ধা তার কথায় সামান্যও বিচলিত হলেন না। তিনি তার আঁচলের খুঁট থেকে কিছু পুরনো, ভাঁজ করা টাকা বের করে সায়মার টেবিলের উপর রাখলেন। তারপর দুই হাত তুলে আসমানের দিকে তাকিয়ে খুব সরল বিশ্বাসে বললেন, "হে আল্লাহ, ডাক্তার তো তার জ্ঞানের কথা বলল। কিন্তু আমি তো জানি, তোমার জ্ঞান সব জ্ঞানের উপরে। তুমি তো শুধু 'কুন' (হও) বললে, 'ফায়াকুন' (হয়ে যায়)। তুমি আমার এই মেয়েটার কোলটাকে খালি রেখো না, মাবুদ।"

বৃদ্ধার এই অটল, সরল বিশ্বাস দেখে সায়মা কিছুটা অবাক হলেন, আবার কিছুটা বিরক্তও হলেন। তার মনে হলো, এই অশিক্ষিত মানুষগুলো শুধু ভাগ্য আর দোয়ার উপর বসে থাকে, বিজ্ঞানের বাস্তবতা বোঝে না। তবুও, পেশাগত দায়িত্ব থেকে তিনি আসমার চিকিৎসা শুরু করলেন।

প্রতিবার যখন আসমা চেক-আপের জন্য আসত, তার শাশুড়ি তার সাথে আসতেন এবং একই রকম সরল বিশ্বাস নিয়ে দোয়া করতেন। সায়মা তাদের চিকিৎসা করতেন তার জ্ঞান দিয়ে, আর বৃদ্ধা ভরসা রাখতেন তার রবের উপর।

তৃতীয় পর্ব: বিজ্ঞানের পরাজয়

কয়েক মাস কেটে গেল। সায়মা তার সমস্ত জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা দিয়ে আসমার চিকিৎসা চালিয়ে গেলেন। কিন্তু কোনো উন্নতি দেখা গেল না। সর্বশেষ রিপোর্ট দেখে সায়মা নিশ্চিত হলেন যে, আসমার মা হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই আর নেই।

তিনি বৃদ্ধাকে তার চেম্বারে ডেকে খুব দুঃখের সাথে বললেন, "দেখুন, আমি আমার সবরকম চেষ্টা করেছি। কিন্তু বিজ্ঞান সব সময় পারে না। আপনাদের আর টাকা খরচ করে লাভ নেই। আপনাদের ভাগ্যে হয়তো সন্তান লেখা নেই।"

সায়মার কথা শুনে আসমার চোখ জলে ভরে গেল, সে কান্নায় ভেঙে পড়ল। কিন্তু বৃদ্ধা তখনও শান্ত। তিনি সায়মার হাত দুটো ধরে বললেন, "আপা, আপনি আপনার চেষ্টার কোনো কমতি রাখেননি, আল্লাহ আপনার ভালো করবেন। কিন্তু আমার আল্লাহর উপর থেকে বিশ্বাস এখনো এক বিন্দুও কমেনি। আমার রব যদি চান, তাহলে বিজ্ঞান যা পারে না, তা-ও সম্ভব হবে। তিনি তো শুধু বলবেন 'হও', আর তা হয়ে যাবে।"

বৃদ্ধার এই কথায় সায়মার মনে এক তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হলো। তার নিজের এত জ্ঞান, এত প্রযুক্তি, এত সাফল্য—সবকিছুই এই সাধারণ বৃদ্ধার সরল বিশ্বাসের কাছে যেন ম্লান হয়ে গেল। তিনি প্রথমবার অনুভব করলেন, তার জ্ঞান কতটা সীমিত, আর আল্লাহর ক্ষমতা কতটা অসীম।

সেই রাতে তিনি বাড়ি ফিরে অনেক কাঁদলেন। তিনি তার নিজের নিঃসন্তান জীবনের দিকে তাকালেন। তিনি বুঝতে পারলেন, তিনিও তো তার সমস্ত জ্ঞান দিয়ে চেষ্টা করেছেন, কিন্তু পারেননি। কারণ দেওয়ার মালিক তিনি নন, দেওয়ার মালিক অন্য কেউ। তিনি এতদিন ধরে বিজ্ঞানের উপর ভরসা করে এসেছেন, কিন্তু সেই সত্তার উপর পুরোপুরি ভরসা করতে পারেননি, যিনি এই বিজ্ঞান এবং তার নিয়মগুলোকে তৈরি করেছেন।

চতুর্থ পর্ব: কুন ফায়াকুন-এর প্রকাশ

প্রায় দুই মাস পর, আসমা এবং তার শাশুড়ি আবার সায়মার ক্লিনিকে এলেন। আসমার শরীরটা ভালো লাগছিল না, তাই তারা দেখাতে এসেছেন। সায়মা ভাবলেন, হয়তো চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে এমন হচ্ছে। তিনি রুটিন চেক-আপের অংশ হিসেবে একটি প্রেগন্যান্সি টেস্ট করতে দিলেন, যদিও তিনি জানতেন এর ফল কী হবে।

কিন্তু যখন রিপোর্টটা তার হাতে এল, তিনি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। রিপোর্ট পজিটিভ! আসমা গর্ভবতী।

সায়মা বারবার রিপোর্টটা পরীক্ষা করলেন, ল্যাবে ফোন করে নিশ্চিত হলেন। কোনো ভুল নেই। যা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রায় অসম্ভব ছিল, তাই ঘটেছে। তার সমস্ত জ্ঞান, সমস্ত যুক্তি এই ঘটনার সামনে অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে রইল।

তিনি যখন খবরটা বৃদ্ধাকে দিলেন, তখন বৃদ্ধা এতটুকুও অবাক হলেন না। তিনি শুধু কেঁদে ফেললেন এবং সিজদায় লুটিয়ে পড়ে বললেন, "আলহামদুলিল্লাহ! আমি জানতাম, আমার রব আমাকে নিরাশ করবেন না।"

বৃদ্ধার সেই প্রশান্ত, কৃতজ্ঞ মুখটার দিকে তাকিয়ে সায়মার মনে হলো, তিনি আজ الطب (চিকিৎসা বিজ্ঞান) এর সবচেয়ে বড় শিক্ষাটা পেয়েছেন। তিনি শিখেছেন, ডাক্তার শুধু উসিলা বা মাধ্যম মাত্র, কিন্তু 'শাফি' বা আরোগ্যদাতা হলেন একমাত্র আল্লাহ। তিনি শিখেছেন, বিজ্ঞান সম্ভাবনার কথা বলে, কিন্তু আল্লাহ অসম্ভবের দুনিয়ায় বাস করেন। তার হুকুম "কুন ফায়াকুন"-এর কাছে পৃথিবীর সব বিজ্ঞান, সব যুক্তি অসহায়।

পঞ্চম পর্ব: আত্মসমর্পণের শান্তি

এই ঘটনা ডক্টর সায়মার জীবনকে পুরোপুরি বদলে দিল। তার মন থেকে জ্ঞানের অহংকার দূর হয়ে গেল। তার জায়গায় জন্ম নিল আল্লাহর প্রতি এক গভীর বিশ্বাস এবং আত্মসমর্পণ।

তিনি এখন তার রোগীদের চিকিৎসা করেন আগের চেয়েও বেশি যত্ন নিয়ে, কিন্তু তিনি আর ফলাফলের নিয়ন্ত্রক হিসেবে নিজেকে ভাবেন না। তিনি এখন বলেন, "আমি আমার জ্ঞান দিয়ে চেষ্টা করছি, বাকিটা আল্লাহর ইচ্ছা। আপনারা আমার জন্যও দোয়া করবেন, আমিও আপনাদের জন্য দোয়া করব।"

তার নিজের জীবনের অপূর্ণতা নিয়েও তার আর কোনো অভিযোগ রইল না। তিনি আল্লাহর ফয়সালার উপর সন্তুষ্ট থাকতে শিখলেন। তিনি তার স্বামীকে বললেন, "আল্লাহ হয়তো আমাদের সন্তান দেননি, কিন্তু তিনি আমাদের মাধ্যমে হাজারো নিঃসন্তান দম্পতির মুখে হাসি ফোটাচ্ছেন। হয়তো এটাই আমাদের জন্য তার পরিকল্পনা।"

তার এই আত্মসমর্পণের কয়েক মাস পর, কোনো চিকিৎসা বা প্রযুক্তি ছাড়াই, আল্লাহ ডক্টর সায়মাকেও মাতৃত্বের নেয়ামত দান করলেন। যখন তিনি প্রথমবার তার প্রেগন্যান্সি রিপোর্ট দেখলেন, তখন তিনি হাসেননি বা কাঁদেননি। তিনি শুধু নীরবে জায়নামাজে দাঁড়িয়ে দুই রাকাত শুকরিয়ার নামাজ আদায় করেছিলেন।

তিনি বুঝেছিলেন, আল্লাহ শুধু তার জ্ঞানকেই পরীক্ষা করেননি, তিনি তার ধৈর্য এবং বিশ্বাসের গভীরতাকেও পরীক্ষা করেছিলেন। যখন তিনি নিজের জ্ঞান ও অহংকারকে বিসর্জন দিয়ে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ করলেন, তখনই আল্লাহ তার জন্য তার রহমতের দরজা খুলে দিলেন। তার জীবনটা এখন "কুন ফায়াকুন" শব্দের এক জীবন্ত উদাহরণ হয়ে রইল—যা শিখিয়ে দেয়, মানুষের চেষ্টা যেখানে শেষ হয়, আল্লাহর করুণা সেখান থেকেই শুরু হয়।


এই গল্পটি যদি আপনাকে আল্লাহর অসীম ক্ষমতা এবং তার উপর পূর্ণ ভরসার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে সাহায্য করে থাকে, তবে এমন আরও ঈমান-জাগানো গল্প শোনার জন্য আমাদের চ্যানেল 'বাংলা অডিও গল্প'-কে সাবস্ক্রাইব করুন। আপনার প্রতিটি সাবস্ক্রিপশন আমাদের নতুন করে ভাবতে এবং ভালো কিছু তৈরি করতে প্রেরণা দেয়।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন

Ads 2